সময়ের খেলা: সময় কখন ধীরে, কখন দ্রুত যায়? Time Perception Theory
আপনি হয়তো খেয়াল করেছেন যে আজকাল সময় অতিদ্রুত চলে যাচ্ছে!বিশেষ করে আমাদের মনে হয়, আজকাল যেন এক সপ্তাহে দুইবার শুক্রবার আসে। কেনো এমন হয়?
সময়ের খেলা: আমরা সময়কে যেভাবে অনুভব করি
আমরা
প্রায়ই বলি, "সময়ের যেন কোনো ঠিক নেই! কখনো এত ধীরে কাটে যে একেকটা মিনিট একেকটা
ঘণ্টার মতো মনে হয়, আবার কখনো এত দ্রুত চলে যায় যে বুঝতেই পারি না কখন সকাল থেকে
রাত হয়ে গেল!" আসলে সময়ের বয়ে যাওয়া নির্দিষ্ট হলেও, আমাদের মস্তিষ্ক একে
সবসময় একইভাবে অনুভব করে না। ক্লাসে বসে বিরক্তিকর লেকচারের সময় মনে হয় সময় থমকে
আছে, অথচ মুভি দেখার সময় তিন ঘণ্টা কেটে যায় চোখের পলকে!
এই রহস্য বোঝার জন্য আমাদের জানতে হবে Time Perception Theory বা "সময়
উপলব্ধির তত্ত্ব" সম্পর্কে।
সময় কখন ধীরে, কখন দ্রুত যায়?
আমাদের মস্তিষ্কে সময় পরিমাপের জন্য কোনো নির্দিষ্ট ঘড়ি নেই, বরং বিভিন্ন নিউরাল
প্রসেস একসঙ্গে কাজ করে আমাদের সময়ের অনুভূতি তৈরি করে। গবেষণা বলছে, আমাদের
মনোযোগ, আবেগ, বয়স, এবং অভিজ্ঞতা
![]() |
Time in Space |
—এসবই ঠিক করে দেয় সময় আমাদের কাছে ধীরে যাবে, না দ্রুত।
প্রথমত, মনোযোগ ও ব্যস্ততা (Attention & Engagement):
যখন আমরা বিরক্তিকর বা একঘেয়ে কোনো কাজ করি, তখন সময় ধীরে চলে। কারণ, আমরা বারবার সময়ের দিকে তাকাই এবং অপেক্ষা করতে থাকি কখন এটা শেষ হবে।
কিন্তু মজার বা চ্যালেঞ্জিং কোনো কাজে ব্যস্ত থাকলে সময় দ্রুত চলে যায়, কারণ আমাদের মন তখন সময়ের দিকে মনোযোগ দেয় না।
উদাহরণ হিসেবে বলতে পারি:
গণিতের ক্লাসে মনে হয় সময় চলছে না। তবে বন্ধুর সঙ্গে আড্ডা দিলে বা মুভি দেখলে মনে হয় এক লাফে কয়েক ঘণ্টা কেটে গেছে!
দ্বিতীয়ত, নতুন অভিজ্ঞতা বনাম অভ্যাসগত জীবন (Novelty vs Routine):
নতুন কোনো কিছু করলে, মস্তিষ্ক সেই অভিজ্ঞতাকে অনেক বেশি তথ্য দিয়ে সংরক্ষণ করে, ফলে মনে হয় সময় ধীরে কেটেছে।
কিন্তু যেসব কাজ প্রতিদিন করি, সেগুলো দ্রুত প্রসেস হয়, তাই সময়ও দ্রুত কেটে যায় বলে মনে হয়।
একটা উদাহরণ দেখে নেওয়া যাক:
ছোটবেলায় গ্রীষ্মের ছুটি অনেক লম্বা মনে হতো, কারণ তখন অনেক নতুন অভিজ্ঞতা হতো। কিন্তু বড় হয়ে একই রুটিনের মধ্যে থাকলে মনে হয় সময় চোখের পলকে চলে যাচ্ছে।
তৃতীয়ত, বয়স ও প্রোপোরশনাল থিওরি (Age & Proportional Theory):
ছোটবেলায় আমাদের কাছে ১ বছর অনেক বড় সময় মনে হতো, কিন্তু এখন ১ বছর যেন চোখের পলকে চলে যায়! কারণ বয়স যত বাড়ে, আমাদের জীবনের মোট সময়ের তুলনায় ১ বছরের গুরুত্ব কমে যায়।
উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যায়:
১০ বছর বয়সে ১ বছর মানে মোট জীবনের ১০%। সেখানে, ২০ বছর বয়সে ১ বছর মানে মোট জীবনের ৫%। আর, ৩০ বছর বয়সে সেটা হয় ৩.৩%। যার কারণে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সময় দ্রুত যেতে থাকে বলে মনে হয়।
চতুর্থত, আবেগ ও উত্তেজনা (Emotion & Arousal):
যখন আমরা ভয় পাই, বিপদের মধ্যে থাকি বা স্ট্রেস অনুভব করি, তখন সময় ধীরে যেতে পারে।
অপরদিকে , সুখের মুহূর্তে সময় দ্রুত চলে যায়, কারণ আমরা তখন সময়কে গুনতে থাকি না।
একটা উদাহরণ দেখে নেওয়া যাক:
দুর্ঘটনার মুহূর্তে মনে হয় সময় থেমে গেছে। তবে, মজার ব্যাপার হলো ঈদের দিন বা কোনো আনন্দঘন মুহূর্তে সময় কেমন উড়ে যায়!
সর্বশেষ, মস্তিষ্কের নিউরাল প্রসেসিং (Brain Processing Speed):
মস্তিষ্ক যদি কোনো পরিস্থিতিকে দ্রুত প্রসেস করে, তাহলে সময় দ্রুত কেটে যায় বলে মনে হয়।আর এর বিপরীতে, যদি মস্তিষ্ক বেশি তথ্য সংগ্রহ করতে থাকে, তাহলে সময় ধীরে কেটে যায়।
উদাহরণ হিসেবে বলতে পারি :
ধীরগতির বক্তার লেকচার শুনলে সময় যেন থেমে থাকে! তবে, দ্রুতগতি অ্যাকশন মুভি দেখলে মনে হয় মুহূর্তের মধ্যেই শেষ হয়ে গেল।
কীভাবে সময়ের অনুভূতিকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়?
১. নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন করো:
নতুন কিছু শেখা বা নতুন জায়গায় ঘুরতে গেলে সময় ধীর মনে হয়। তাই জীবনকে একঘেয়ে না বানিয়ে নতুন অভিজ্ঞতার সন্ধান করা উচিত।
২. Mindfulness চর্চা করো:
যদি প্রতিটি মুহূর্তে মনোযোগ দেওয়া যায়, তাহলে সময় ধীরে কেটে যাবে। ধ্যান বা mindfulness প্র্যাকটিস করলে সময়ের অনুভূতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসে।
৩. প্রতিদিনের রুটিন পরিবর্তন করো:
একই কাজ বারবার করলে সময় দ্রুত চলে যায় বলে মনে হয়। মাঝে মাঝে নতুন কিছু চেষ্টা করো—নতুন বই পড়ো, নতুন বন্ধু বানাও, নতুন দক্ষতা শেখার চেষ্টা করো।
৪. ব্যস্ত থাকো, কিন্তু আনন্দের সঙ্গে:
যদি সময়কে দীর্ঘ করতে চাও, তাহলে শুধুমাত্র ব্যস্ত থাকলেই হবে না, বরং এমন কিছু করো যা তোমার আগ্রহ তৈরি করে। পড়াশোনাকে মজার চ্যালেঞ্জ বানিয়ে নাও!
বিষয়টা একটা গল্পের মাধ্যমে বোঝা যাক:
নাবিলা ক্লাসে বসে আছে, সামনে গণিত স্যারের লেকচার চলছে। বোর্ডে সূত্রগুলো উঠছে, কিন্তু তার মাথায় কিছু ঢুকছে না। সে ঘড়ির দিকে তাকায়—মাত্র ১০ মিনিট পেরিয়েছে! অথচ মনে হচ্ছে যেন এক ঘণ্টা হয়ে গেছে।
আবার, স্কুল শেষ হতেই সে বাসায় এসে ল্যাপটপ অন করল, কারণ আজ তার প্রিয় গেমের নতুন আপডেট এসেছে। খেলা শুরু হতে না হতেই সে গভীরভাবে ডুবে গেল। মিশন শেষ করতে করতে হঠাৎ মা এসে ডাক দেয়,
— "নাবিলা, রাত ১১টা বাজে!"
সে বিস্মিত হয়ে তাকায়—"কীভাবে? আমি তো মাত্র একটু আগেই শুরু করলাম!"
পরের দিন তার এক বন্ধু হেসে বলল,
— "এটাই হলো Time Perception Theory! বিরক্তিকর কিছু করলে সময় ধীরে চলে, কিন্তু মজার কিছু করলে সময় দ্রুত কেটে যায়!"
নাবিলা মাথা চুলকায়, "তাহলে কি আমার পড়াশোনাকেও মজার বানাতে হবে?"
বন্ধু হাসে, "ঠিক তাই! যদি পড়াকে গেমের মতো ভাবতে পারিস, তাহলে সময়ও দ্রুত কেটে যাবে!"
সেদিনের পর থেকে নাবিলা পড়ার সময় নতুন কৌশল নেয়—নিজেকে চ্যালেঞ্জ দেয়, নোট নেওয়াকে ধাঁধার মতো বানায়। ধীরে ধীরে সময় আগের মতো আর থেমে থাকে না।
শেষ কথা:
সময়ের অনুভূতি সম্পূর্ণভাবে আমাদের মনোযোগ, অভিজ্ঞতা, আবেগ, এবং জীবনযাত্রার ওপর নির্ভর করে। নতুন অভিজ্ঞতা নিলে, সচেতনভাবে জীবন উপভোগ করলে, এবং আগ্রহী হয়ে কাজ করলে সময় ধীর মনে হয়, আর একঘেয়ে হলে মুহূর্তেই ফুরিয়ে যায়।
-Abdullah Sifat