আদর্শ শিক্ষক হয়ে ওঠার ৩০টি করণীয়: শ্রেণিকক্ষে সফলতার চাবিকাঠি
শিক্ষকতায় আপনি কেন এলেন তা নিজের কাছে স্পষ্ট রাখুন। চাকরি, টাইম-পাস অথবা পার্টটাইম জব হিসেবে নয়, শিক্ষকতাকে একটি মহান সেবা বা মিশন হিসেবে গ্রহণ করুন। তাহলেই আপনি শিক্ষকতায় ভালো করবেন।
একজন আদর্শ শিক্ষক হয়ে ওঠার জন্য প্রয়োজন সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি, শিক্ষার্থীদের প্রতি যত্নশীল মনোভাব এবং নৈতিক দায়িত্ববোধ। এই গাইডলাইনে শিক্ষকতার সফলতার জন্য ৩০টি গুরুত্বপূর্ণ করণীয় তুলে ধরা হয়েছে, যা শ্রেণিকক্ষে আপনার দক্ষতা ও প্রভাব বাড়াতে সহায়তা করবে।
•
'অর্থের বিনিময়ে শিক্ষা' নয়, 'আলোকিত মানুষ গড়ার জন্যে শিক্ষা'- এ নীতি নিয়ে শিক্ষার্থীদের সামনে দাঁড়ান।
•
ক্লাসে এসে শিক্ষার্থীদের সাথে হাসিমুখে কুশল বিনিময় করুন।
•
সময়মতো ক্লাসে আসুন। দেরি করে ক্লাসে এসে স্লাইডের মাধ্যমে চটজলদি পড়িয়ে ফাঁকি দেয়ার মানসিকতা পরিহার করুন।
•
বড় হওয়ার স্বপ্ন ও লক্ষ্য শিক্ষার্থীর মনে এঁকে দিন।
এ লক্ষ্য অর্জনে তার ঘাটতিগুলোকে সহজভাবে নিন। তার যে কিছু অনন্য মেধা, গুণ ও যোগ্যতা আছে তা খুঁজে পেতে তাকে সাহায্য করুন।
•
এক শিক্ষার্থীকে কখনোই অন্য শিক্ষার্থীর সাথে তুলনা করবেন না। প্রত্যেক শিক্ষার্থীই অনন্য। তাদের এ অনন্যতাকে গুরুত্ব দিন। সর্বতোভাবে শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত করুন।
•
শিক্ষার্থীদের নাম জানুন ও মনে রাখুন।
'অ্যাই ছেলে/ অ্যাই মেয়ে' কিংবা রোল নম্বর ধরে ডাকবেন না। নাম ধরে ডাকলে শিক্ষার্থীরা অনুপ্রাণিত হয়।
•
শিক্ষার্থীদের সাথে সম্পর্কের সীমা বজায় রেখে বন্ধুসুলভ আচরণ করুন। তবে রসিকতা করে নিজের ব্যক্তিত্বকে ক্ষুণ্ণ করবেন না।
•
বিপরীত লিঙ্গের শিক্ষার্থীদের সাথে কথায়, বডি ল্যাঙ্গুয়েজে শালীন ও মার্জিত আচরণ করুন। শোভন সীমা বজায় রাখুন।
•
ক্লাস নেয়ার আগে হোমওয়ার্ক করুন, প্রস্তুতি নিন। যে বিষয়ে পড়াচ্ছেন তার আপডেটেড কারিকুলাম সম্পর্কে অবহিত থাকুন।
প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ ব্যবহার করুন।
•
প্রতিটি ক্লাস নেয়ার আগে পাঁচ মিনিট চোখ বন্ধ করে মনের পর্দায় দেখুন- ক্লাসে সবাই আপনার পড়ানো বুঝতে পারছে, আপনার সান্নিধ্য তাদেরকে আনন্দিত ও অনুপ্রাণিত করছে, আপনার কথাগুলো তারা মনোযোগ দিয়ে শুনছে, উদ্বুদ্ধ হচ্ছে। আপনাকে সুন্দরভাবে গ্রহণ করছে। দেখবেন, বাস্তবেও তা-ই হচ্ছে।
•
শিক্ষার্থীদের নীতিকথা বলার আগে নিজে তা অনুসরণ করুন। তাহলেই আপনার কথার শুভপ্রভাব তাদের ওপর পড়বে।
•
কোনো পড়া বোঝানোর সময় শিক্ষার্থীদের মতামত নিন- আসলেই তারা বুঝতে পারছে কিনা। এর পরিপ্রেক্ষিতে নিজের বক্তব্যকে আরো সহজ এবং গল্প ও উদাহরণসমৃদ্ধ করুন।
•
নিজেকে শিক্ষার্থীদের অবস্থানে নিয়ে গিয়ে ধৈর্য সহকারে বোঝানোর চেষ্টা করুন।
•
কোনো শিক্ষার্থী পড়া বুঝতে না পারলে তাকে গালমন্দ করবেন না। তার ওপর বিরক্তও হবেন না; বরং ক্লাসের পরে সুবিধাজনক সময়ে পড়া বুঝিয়ে দিন। প্রশান্ত থাকুন, তাহলে তার মতো করে তাকে বোঝাতে পারবেন।
•
নিজের লেখা বই/ নোট পড়তে বাধ্য করবেন না। অন্য লেখকদের বইকে প্রাপ্য সম্মান দিলে আপনার সম্মানও বেড়ে যাবে।
•
যে বিষয় পড়াচ্ছেন তা কত জটিল/ কঠিন এবং সে-বিষয়ে সাধারণত কেউ ভালো করতে পারে না- এ ধরনের কথা বলে শিক্ষার্থীদের ভয় দেখাবেন না। শিক্ষক হিসেবে আপনার দেয়া সাহস শিক্ষার্থীদের সে-বিষয়ের প্রতি মনোযোগী করে তুলবে।
আর মনোযোগ যে-কোনো কঠিন বিষয়কে সহজ করে তোলে।
•
শিক্ষার্থীদের কাছে কোনো শিক্ষককে নিয়ে কটু মন্তব্য করবেন না।
প্রশংসা করতে না পারলে মৌন থাকুন।
•
কোন শিক্ষকের চেয়ে কোন শিক্ষক ভালো পড়ান/ কে বেশি জনপ্রিয়- এ জাতীয় প্রশ্ন করে শিক্ষার্থীদের বিভ্রান্তিতে ফেলবেন না।
•
ক্লাসে কম পড়িয়ে নিজের কোচিং বা ব্যাচে পড়তে প্রলুব্ধ করা বা বাধ্য করা থেকে বিরত থাকুন।
•
প্রশ্নপত্র ফাঁসের চক্রান্তে জড়াবেন না। শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদেরকে ফাঁস হওয়া প্রশ্ন নিতে প্রলুব্ধও করবেন না। অন্যায় করা আর অন্যায়ে ইন্ধন দেয়া-দুটোই অপরাধ।
•
কোনো প্রশ্নের উত্তর জানা না থাকলে বলুন- এর উত্তর আপনি পরে জেনে জানাবেন। এতে আপনার জ্ঞানের ভাণ্ডার সমৃদ্ধ হবে। ভুল উত্তর দেয়া/ গোঁজামিল দেয়া বা এরকম প্রশ্ন কেন করেছে ভেবে রাগান্বিত হওয়া থেকে বিরত থাকুন।
•
ভালো রেজাল্টধারীদের প্রতি সুনজর দিতে গিয়ে যারা অপেক্ষাকৃত কম ভালো করছে, তাদের প্রতি অমনোযোগী হবেন না। আপনার একটু সহযোগিতা ও চেষ্টা তাদেরকেও এগিয়ে নেবে।
•
ব্যক্তিগত রোষের কারণে কোনো শিক্ষার্থীকে কম নম্বর দেয়ার মতো অন্যায় করবেন না। এ ব্যাপারে সচেতন ও সংযত থাকুন। আসলে ক্ষমা সর্বোত্তম গুণ এবং স্রষ্টা ক্ষমাশীলকে পছন্দ করেন।
•
দীর্ঘদিন কোনো শিক্ষার্থী আপনার ক্লাসে অনুপস্থিত অথবা অনিয়মিত থাকলে নিজ উদ্যোগে তার ও তার পরিবারের সাথে যোগাযোগ করুন।
•
জন্মদিনে কেক, ফাস্ট ফুড, চকলেট স্কুলে আনতে উদ্বুদ্ধ না করে শিক্ষার্থীদের গাছ লাগানো, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম বা যে-কোনো সৎকর্মে অনুপ্রাণিত করুন।
•
শিক্ষার্থীদেরকে অপদার্থ, নালায়েক, মূর্খ, বোকা- এ জাতীয় নেতিবাচক কথা বলা থেকে বিরত থাকুন। ইতিবাচক কথার মাধ্যমে তাদেরকে উদ্বুদ্ধ ও অনুপ্রাণিত করুন।
•
বকাঝকা ও গালিগালাজের মাধ্যমে মানসিক অত্যাচার কিংবা শারীরিক শাস্তি আসলে শিক্ষক হিসেবে আপনার পরাজয়কেই প্রমাণিত করে। তাই অভিযুক্ত শিক্ষার্থীদের মনোভাব বুঝে সংশোধনের জন্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিন।
•
কথা শোনে না, পড়তে চায় না, অমনোযোগী-শিক্ষার্থীদের সম্পর্কে এভাবে ঢালাও অনুযোগ না করে তাদের প্রতি সমমর্মী হোন, তাদেরকে মনোযোগী করে তোলার কৌশলগুলো নিয়ে ভাবুন ও পদক্ষেপ নিন।
•
জনপ্রিয় শিক্ষক হওয়ার বাসনা থেকে শিক্ষার্থীদের সাথে ব্যক্তিগত ফোনালাপ বা তথাকথিত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের সাথে সম্পৃক্ত হওয়া থেকে সচেতনভাবে বিরত থাকুন।
•
ক্লাস চলাকালে মোবাইলে কথা বলা থেকে বিরত থাকুন। ফোন সাইলেন্ট মোডে রাখুন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দায়িত্বরত অবস্থায় বিনোদনের জন্যে ইন্টারনেট, ফেসবুক অথবা ইউটিউবে ব্যস্ত থাকবেন না।
•
কোনো শিক্ষার্থী কথা বলতে এলে ধৈর্য ধরে তার কথা শুনুন। সেই মুহূর্তে সম্ভব না হলে বা শিক্ষার্থী পরে কোনো সময় দেখা করতে চাইলে এপয়েন্টমেন্ট দিন।
নিজের রুমের চেয়ে টিচার্স কমনরুমে কথা বলাকে অগ্রাধিকার দিন।
•
জরুরি নোটিশ বা ডকুমেন্ট আদানপ্রদানের জন্যে 'ফেসবুক গ্রুপ' করতে শিক্ষার্থীদের বাধ্য করবেন না। প্রয়োজনে ই-মেইল করুন।
•
পিকনিক/ বনভোজন/ আনন্দভ্রমণ/ শিক্ষাসফরে খেয়াল রাখুন- ছাত্রছাত্রীরা চোখের আড়াল হচ্ছে কিনা। সচেতন থাকুন- আনন্দের উন্মাদনায় যেন কোনো দুর্ঘটনা না ঘটে।
•
শিক্ষার্থীদের কাছে নিজেকে রোল মডেল হিসেবে উপস্থাপন করুন।
©Collected