অন্নদামঙ্গল - ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর: একটি সংক্ষিপ্ত আলোচনা
অন্নদামঙ্গল ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর রচিত একটি উল্লেখযোগ্য মঙ্গলকাব্য। বাংলা সাহিত্যের অন্ধকার যুগের অবসানকালে মঙ্গলকাব্যের উদ্ভব হয়। ভারতচন্দ্র উপলব্ধি করেছিলেন যে ঐতিহ্যবাহী মঙ্গলকাব্যের দীর্ঘসূত্রতা বাংলা সাহিত্যে নবরূপ সঞ্চারের পথে বাধা সৃষ্টি করছে। তাই তিনি মঙ্গলকাব্যের আদি কবিদের অনুসরণ করলেও, তার রচনাশৈলী স্বতন্ত্র ও অভিনব। কাব্যটি দেবী অন্নপূর্ণার মাহাত্ম্য বর্ণনায় নিবেদিত। ১৭৫২ খ্রিষ্টাব্দে এই কাব্য রচনা করেন কবি, নদিয়ারাজ কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের পৃষ্ঠপোষকতায়। কৃষ্ণচন্দ্র বাংলা মূর্তিপূজায় দেবী অন্নপূর্ণার পূজার প্রচলন করেন এবং দেবীর মাহাত্ম্য প্রতিফলিত একটি কাব্য রচনার জন্য ভারতচন্দ্রকে অনুরোধ করেন। এর ফলশ্রুতিতেই রচিত হয় অন্নদামঙ্গল, যা তিনটি খণ্ডে বিভক্ত: (ক) অন্নদামঙ্গল বা অন্নদামাহাত্ম্য, (খ) বিদ্যাসুন্দর বা কালিকামঙ্গল এবং (গ) মানসিংহ বা অন্নপূর্ণামঙ্গল।
অন্নদামঙ্গল - ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর |
অন্নদামঙ্গল কাব্য তিনটি খণ্ড নিয়ে গঠিত:
অন্নদামঙ্গল:
এখানে দেবী অন্নদার মাহাত্ম্য, সতীর দেহত্যাগ, শিব-পার্বতীর বিবাহ, বসুন্ধর ও নলকুবেরের হরিহোড় ও ভবানন্দ মজুমদার রূপে মর্তে আগমন, দেবীর ভবানন্দের গৃহে প্রবেশ প্রভৃতি পৌরাণিক ও কল্পিত কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। অন্নদামঙ্গল কাব্যের প্রথম খণ্ডটি দেবী অন্নদার মাহাত্ম্য এবং বিভিন্ন পৌরাণিক ও কল্পিত কাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত। এটি কাব্যের কেন্দ্রীয় অংশ এবং এর রচনায় ভারতচন্দ্রের সৃজনশীলতা, পৌরাণিক জ্ঞান এবং কাব্যিক দক্ষতার উজ্জ্বল প্রকাশ দেখা যায়। দেবী অন্নদা (অন্নপূর্ণা) মূলত সমৃদ্ধি, অন্নদান এবং মানুষের জীবনে শুভ ফল প্রদানের প্রতীক। কাব্যের প্রথম ভাগে দেবীর এই দিকটি বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে। কবি দেখিয়েছেন, দেবী অন্নপূর্ণার আশীর্বাদ ছাড়া জীবের কল্যাণ সম্ভব নয়। তিনি শুধু অন্নের দেবী নন; তিনি মানবজীবনের সার্বিক কল্যাণের প্রতীক। পুরাণের বিখ্যাত কাহিনী সতীর দেহত্যাগের ঘটনা কাব্যে স্থান পেয়েছে। সতী, মহাদেবের পত্নী, তার পিতার (দক্ষ) অভব্য আচরণে অপমানিত হয়ে নিজের দেহত্যাগ করেন। এই কাহিনী ভারতচন্দ্রের কাব্যে দেবী অন্নপূর্ণার আখ্যানের ভূমিকা রচনা করে। সতীর দেহত্যাগ এবং শিবের শোক এই মহাজাগতিক ঘটনার ভিত্তিতে দেবী শক্তির মাহাত্ম্য প্রতিষ্ঠিত হয়। সতীর দেহত্যাগের পর শিব-পার্বতীর বিবাহের কাহিনী একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই বিবাহ পৌরাণিক প্রেক্ষাপটে দেবী শক্তির পুনর্জন্ম এবং শিবের সাথে তার মিলনের প্রতীক। কবি এই অংশে শিব-পার্বতীর বিবাহ উৎসবের বর্ণনায় চিত্রধর্মী এবং অলঙ্কারশোভিত ভাষার ব্যবহার করেছেন। কাব্যের আরেকটি উল্লেখযোগ্য অংশ বসুন্ধর ও নলকুবেরের হরিহোড় (কলহ) ঘটনা। এ দুটি চরিত্র স্বর্গের অধিবাসী। তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেবতাদের অসন্তুষ্টি সৃষ্টি করে, এবং শাপভ্রষ্ট হয়ে তারা মর্তে নেমে আসে। এই পৌরাণিক কাহিনী দেবতার ইচ্ছায় মানুষের জীবনে ঈশ্বরীয় শক্তির হস্তক্ষেপের ধারণা তুলে ধরে। বসুন্ধর ও নলকুবের মর্তে ভবানন্দ মজুমদার ও তার পরিবারের রূপে জন্মগ্রহণ করেন। ভবানন্দ মজুমদারের চরিত্র কাব্যে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তিনি দেবী অন্নপূর্ণার আশীর্বাদে রাজত্ব ও রাজা উপাধি লাভ করেন। কবি দেখিয়েছেন, দেবীর কৃপা ছাড়া ভবানন্দের উত্থান সম্ভব ছিল না। দেবী অন্নপূর্ণা একসময় ভবানন্দ মজুমদারের গৃহে প্রবেশ করেন। দেবীর এই আগমন কাব্যের কেন্দ্রীয় ঘটনা, যা মানবজীবনে দেবত্বের উপস্থিতি এবং দেবীর কৃপা লাভের গুরুত্বকে নির্দেশ করে। ভবানন্দের পরিবারের প্রতি দেবীর আশীর্বাদ তাদের উন্নতির পথ সুগম করে। ভারতচন্দ্র কাব্যে পুরাণ থেকে আখ্যান সংগ্রহ করলেও এতে কল্পিত ঘটনার সংযোজন করেছেন। বসুন্ধর ও নলকুবেরের শাপগ্রস্ত হয়ে ভবানন্দ মজুমদার রূপে মর্তে আগমন এবং দেবীর সরাসরি তাদের গৃহে প্রবেশ এই কল্পনার অনন্য দৃষ্টান্ত। এই অংশে ভারতচন্দ্র অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ছন্দ, অলঙ্কার, এবং ভাষার গাঁথুনির মাধ্যমে পৌরাণিক এবং কল্পিত কাহিনীকে একসূত্রে গেঁথেছেন। কাব্যে চিত্রধর্মী বর্ণনা, জীবন্ত চরিত্রচিত্রণ এবং সংলাপের প্রাঞ্জলতা এই অংশকে বিশেষ আকর্ষণীয় করেছে।
বিদ্যাসুন্দর:
এতে বর্ধমানের রাজকন্যা বিদ্যা ও কাঞ্চীর রাজকুমার সুন্দরের প্রেমকাহিনী বর্ণিত হয়েছে। এই খণ্ডে দেবী কালিকার মাহাত্ম্য প্রচারিত হয়েছে। বিদ্যাসুন্দর খণ্ডটি ভারতচন্দ্র রচিত অন্নদামঙ্গল কাব্যের দ্বিতীয় অংশ, যেখানে বর্ধমানের রাজকন্যা বিদ্যা এবং কাঞ্চীর রাজকুমার সুন্দরের প্রেমকাহিনী বর্ণিত হয়েছে। এটি মূল কাহিনীর সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত না হলেও কাব্যের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এখানে প্রেম, ত্যাগ এবং দেবী কালিকার মাহাত্ম্য পাশাপাশি স্থান পেয়েছে।
বিদ্যা, বর্ধমানের রাজা চন্দ্রচূড়ের একমাত্র কন্যা, যার অসাধারণ সৌন্দর্য এবং বিদ্যাবুদ্ধি রাজ্যের গর্ব। তার জন্য সারা দেশে বহু রাজকুমারের প্রস্তাব এলেও বিদ্যা কাউকে পছন্দ করেননি। অন্যদিকে, সুন্দর কাঞ্চীর রাজা রত্নসেনের পুত্র। সুন্দরের ব্যক্তিত্ব, বীরত্ব এবং সৌন্দর্য তাকে সমকালীন যুবরাজদের মধ্যে অনন্য করেছে। বিদ্যা ও সুন্দরের দেখা হয় দেবী কালিকার আশীর্বাদে। প্রথম দেখায় তারা একে অপরকে প্রেম নিবেদন করেন। কিন্তু তাদের প্রেম সহজ ছিল না। দুজনের রাজপরিবারের মধ্যে শত্রুতা থাকায় তাদের এই সম্পর্ক বাধার মুখে পড়ে। বিদ্যা ও সুন্দরের প্রেম তাদের সামাজিক ও পারিবারিক প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করার সংগ্রাম ও সাহসিকতার গল্প হয়ে ওঠে। কাহিনীতে দেবী কালিকা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বিদ্যা ও সুন্দরের মিলনের জন্য দেবীর আশীর্বাদ অপরিহার্য। দেবীর কৃপায় তারা নিজেদের ভালোবাসা রক্ষা করতে সক্ষম হয়। দেবী কালিকাকে এখানে শক্তির দেবী এবং প্রেম ও কল্যাণের রক্ষক হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। দেবীর আশীর্বাদ কেবল বিদ্যা ও সুন্দরের প্রেমকাহিনীকে এগিয়ে নিয়ে যায় না, এটি সমাজ ও ধর্মের মধ্যে দেবতার ভূমিকার গুরুত্বও তুলে ধরে। বিদ্যা ও সুন্দরের প্রেমকাহিনী ভারতচন্দ্রের কাব্যিক প্রতিভার পরিচায়ক। এখানে প্রেমকে শুধু রোমান্টিক আবেগ হিসেবে নয়, ত্যাগ ও সাহসের প্রতীক হিসেবে দেখানো হয়েছে। ভারতচন্দ্র কাহিনীর বর্ণনায় চিত্রকল্প, ছন্দ এবং অলঙ্কারের নিপুণ প্রয়োগ করেছেন। বিশেষ করে, বিদ্যা ও সুন্দরের প্রেমালাপ এবং তাদের আবেগ প্রকাশে কবির ভাষাশৈলী অনবদ্য। কাহিনীতে দেবী কালিকার ভূমিকা পৌরাণিক উপাদান যোগ করে। অন্যদিকে, বিদ্যা ও সুন্দরের প্রেমকাহিনী মানবিক আবেগের গভীর প্রকাশ। এই দুই উপাদানের সমন্বয়ে কাহিনীটি অসাধারণ হয়ে উঠেছে। বিদ্যা কেবল সৌন্দর্যের জন্য পরিচিত নয়; তার ব্যক্তিত্ব এবং আত্মমর্যাদাবোধ তাকে এক অনন্য নারীচরিত্রে পরিণত করেছে। বিদ্যা ও সুন্দরের প্রেম সামাজিক এবং পারিবারিক বিরোধের মধ্যে এগিয়ে চলে। এই বিরোধ কাহিনীর উত্তেজনা বাড়ায়। দেবী কালিকা কেবল এক দেবী নন; তিনি প্রেমের রক্ষক, শক্তি এবং বাধা অতিক্রমের প্রতীক।
মানসিংহ:
মানসিংহ খণ্ডটি ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গল কাব্যের তৃতীয় অংশ, যেখানে ঐতিহাসিক ও পৌরাণিক ঘটনার সংমিশ্রণে ভবানন্দ মজুমদার, মানসিংহ এবং প্রতাপাদিত্যের বিভিন্ন ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। এই খণ্ডে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং দেবী অন্নপূর্ণার কৃপায় ভবানন্দ মজুমদারের উত্থানের কাহিনী চিত্রিত হয়েছে। ভবানন্দ মজুমদার ছিলেন নদিয়ারাজ কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের পূর্বপুরুষ। তার চরিত্রের মাধ্যমে ভারতচন্দ্র কাব্যে ধর্ম, রাজনীতি এবং দেবীর কৃপা প্রতিষ্ঠার ধারণা তুলে ধরেছেন। ভবানন্দকে দেবী অন্নপূর্ণার আশীর্বাদে শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে দেখা যায়। কবি দেখিয়েছেন, ভবানন্দ মজুমদার আসলে স্বর্গের বসুন্ধর ও নলকুবেরের পুনর্জন্ম, যারা শাপগ্রস্ত হয়ে মর্তে জন্ম নেন। দেবী অন্নপূর্ণা তাদের প্রতি কৃপা প্রদর্শন করেন এবং ভবানন্দের উত্থান নিশ্চিত করেন। ভবানন্দ কীভাবে জাহাঙ্গীরের সমর্থন পেয়ে রাজত্ব ও রাজা উপাধি অর্জন করেন, তা কাব্যে বর্ণিত হয়েছে। এই কাহিনী মধ্যযুগীয় রাজনীতির চিত্র তুলে ধরে এবং দেবীর ভূমিকা মানবজীবনে সাফল্যের মূল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। মানসিংহ, মুঘল সম্রাট আকবরের সেনাপতি, এই খণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তার চরিত্রের মাধ্যমে ভারতচন্দ্র ঐতিহাসিক ও পৌরাণিক ঘটনাগুলির সংমিশ্রণ ঘটিয়েছেন। মানসিংহের অধীনে ভবানন্দের সামরিক সাফল্যের বর্ণনা কাব্যে এসেছে। মানসিংহ ভবানন্দকে সম্রাটের কাছে সুপারিশ করেন, যা তার রাজনৈতিক উত্থানের পথ প্রশস্ত করে। মানসিংহের নেতৃত্বে বিভিন্ন যুদ্ধের বর্ণনা কাব্যে এসেছে। এসব যুদ্ধ শুধু সামরিক বিজয়ের গল্প নয়, তা ভবানন্দের ব্যক্তিত্ব এবং দক্ষতাকেও তুলে ধরে।
প্রতাপাদিত্য:
যিনি বাংলার এক বিদ্রোহী জমিদার ও বীর হিসেবে পরিচিত, এই খণ্ডের অন্যতম আকর্ষণীয় চরিত্র। প্রতাপাদিত্যের বিদ্রোহ, তার বীরত্ব এবং মুঘল সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে তার সংগ্রাম কাব্যে বিস্তারিত বর্ণিত হয়েছে। প্রতাপাদিত্য মুঘল শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন এবং বাংলায় নিজের শাসন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন। তার এই বিদ্রোহ মুঘল সাম্রাজ্যের কাছে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। প্রতাপাদিত্যকে পরাজিত করতে মানসিংহের নেতৃত্বে অভিযান চালানো হয়। এই সংঘর্ষের বর্ণনা কাব্যে অত্যন্ত চিত্রধর্মীভাবে উপস্থাপিত হয়েছে।
অন্নদামঙ্গল কাব্য তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের জন্য মঙ্গলকাব্যের প্রচলিত ধারার থেকে স্বতন্ত্র স্থান অধিকার করেছে। দেবদেবীর মাহাত্ম্যের পাশাপাশি এখানে ভবানন্দ মজুমদারের মাহাত্ম্যও বর্ণিত হয়েছে। বিশেষত প্রথম খণ্ডটি ভাষা, ছন্দ ও অলঙ্কারের উৎকর্ষে সেরা। সমাজচিত্র অঙ্কনে ভারতচন্দ্র অতুলনীয়, যা এই কাব্যকে বাংলা সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে।